প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রিসভার সব সদস্যের পদত্যাগ দাবির এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একই সঙ্গে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া তারা সরকার পতনের দাবিতে অসহযোগের ডাক দিয়েছে। গতকাল শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে এই এই ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। নাহিদ বলেন, আমাদের এক দফা হলো শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং এই সরকারের লুটপাট-দুর্নীতির বিচার। আমরা জেলের তালা ভেঙে আমাদের ভাইদের আনব। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করে সম্বিলিত মোর্চা গঠন করব। দেশের রূপরেখা ঘোষণা করব। আগামীকাল (আজ রোববার) থেকে সর্বত্র অসহযোগ আন্দোলন হবে। তিনি আরও বলেন, যদি ইন্টারনেট বন্ধ হয়, কারফিউ জারি হয় আমরা মেনে নেব না। সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, এটা জনগণ মানবে না। আপনারা যদি অস্ত্র চালান তাহলে প্রতিরোধ হবে। আমরা সব গণহত্যার বিচার করব বাংলার মাটিতে। এর আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শহীদ মিনারে এসে যোগ দেন। সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি, প্রেস ক্লাব বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে আসেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আন্দোলনকারীরা শহীদ মিনার এলাকা থেকে বিভিন্ন দিকে চলে যান। এ সময় এক দল তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসার গেট ভাঙার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের বিচ্ছিন্নভাবে টিএসটির সামনে রাজু ভাস্কর্যের সামনে ও শাহবাগে জড়ো হতে দেখা যায়। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে তাদের অনেককে শাহবাগ ছেড়ে চলে যেতে দেখা যায়।
এর আগে দুপুর দেড়টা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দলে দলে যোগ দিতে থাকেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ। এর আগে সকাল সাড়ে ১১টায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শান্তি সমাবেশ শুরু করে শান্তিকামী চিকিৎসক ও নার্স সমাজ। তারা গতকাল শনিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত অবস্থান করেন সেখানে। বিকালে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। এতে জনসমুদ্রে পরিণত হয় এলাকাটি। গতকাল শনিবার বিকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি থাকলেও আন্দোলনকারীরা তা উপেক্ষা করে শহীদ মিনার চত্বরে বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। শহীদ মিনারের আশেপাশের সড়ক, ভবন ও দেওয়ালে বিভিন্ন দাবির কথা লিখতে থাকেন তারা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রিকশাচালক, সিএনজি অটোরিকশাচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ যোগ দিয়েছেন আন্দোলনে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরাও। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সমাবেশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ, জগন্নাথ হলসহ অন্যান্য রাস্তায় মানুষ অবস্থান নেয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সমাবেশে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে থাকে। বিকাল ৫টা পর্যন্ত স্লোগানে মুখর ছিল শহীদ মিনার এলাকা। এ সময় বেসরকারি কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা কিন্তু কোটা সংস্কারের মতো ছোট একটা আন্দোলন শুরু করেছিলাম। কিন্তু যখন দেখেছি আমাদের ভাইয়েরা নিহত হয়েছেন তখন কিন্তু আর সেটা কোটা সংস্কারের আন্দোলন রইলো না। এখন আমরা হত্যার বিচার চাইছি।
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট সহিংসতায় রাজধানীসহ সারাদেশ বিক্ষোভে উত্তাল। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি যোগ দিয়েছে অভিভাবক, শিক্ষক ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার দুপুর থেকে শহীদ মিনার এলাকায় জড়ো হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচিতে যোগ দিতে দলে দলে শিক্ষার্থীরা এসে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেয়। এতে করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে নেয় বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে যানচলাচল। এছাড়াও যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাগ, সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীরা। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো ধরনের যানবাহন ঢাকা থেকে বের হতে পারছে না এবং ঢাকায় ঢুকতেও পারছে না। অপরদিকে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও দিনাজপুরেও বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা।
গতকাল শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে শিক্ষার্থীদের অবরোধের ফলে যানচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে রাজধানীজুড়ে। গতকাল সকাল থেকে যাত্রাবাড়ী, শান্তিনগর, সাইন্সল্যাব, রামপুরা, মেরুল বাড্ডা, নতুন বাজার, কুড়িল বিশ্বরোড, মিরপুর-১০ ও উত্তরায় অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। এসময় ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল দুপুর সোয়া ১টার দিকে রাজধানীর প্রগতি সরণি এলাকার যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে জড়ো হয় শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে হুট করে তারা প্রধান সড়কে নেমে আসেন। তাদের উপস্থিতিতে বন্ধ হয়ে যায় প্রগতি সরণির যানচলাচল। বেলা ১১টার দিকে ইস্ট ওয়েস্ট ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। পরে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থীরা। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত অন্তত তিন হাজার শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছেন এই বিক্ষোভ সমাবেশে। দুপুর ১২টা থেকে সায়েন্সল্যাব মোড়ে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা। এ বিক্ষোভে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নামতে দেখা যায় জনতার ঢল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এ আন্দোলনে সংহতি জানাচ্ছেন পথচারী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার জনগণ। এ আন্দোলন ঘিরে পুরো সায়েন্সল্যাব এলাকার সড়ক আন্দোলনকারীদের অবস্থানে বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও কোটা সংস্কার আন্দোলনে সৃষ্ট সহিংসতায় নিহত ও গণগ্রেফতারের প্রতিবাদ ও ৯ দফা দাবি আদায়ে মিরপুর ১০ গোল চত্বরে প্রায় চার ঘণ্টা বিক্ষোভ শেষে করে সড়ক ছেড়েছেন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ১০ নম্বর গোল চত্বরে জড়ো হয়ে এই বিক্ষোভ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। পরে বিকাল সাড়ে ৪টায় পরবর্তী কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়ে ধীরে ধীরে স্থান ত্যাগ করতে থাকেন তারা। এ সময় মিরপুর ১০ দিয়ে চলাচল করা গাড়িগুলো মিরপুর ২ দিয়ে যাতায়াত করে। বিক্ষোভ শেষে ৪টা ৫০ মিনিটে আবারও যাতায়াত স্বাভাবিক হয়। এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মিরপুর ১০-এর পশ্চিম পাশে পুলিশ সতর্ক অবস্থান নেয়। পরে বিক্ষোভ শুরু হলে সোয়া ১টায় মিরপুর মডেল থানার ডিসি, এডিসি, ওসিসহ অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের কাছে ডেকে কথা বলেন। তারা আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিতে বলেন। কোনও বহিরাগত এসে যেন কোনও ধরনের সহিংসতা করতে না পারে, সেই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেন শিক্ষার্থীদের।
মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় প্রথম ব্যারিকেড দেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এরপর কিছুদূর আসলে রায়েরবাগ অংশেও ব্যারিকেড দেখা যায়। সেখানে সেøাগানে সেøাগানে মুখরিত করে রাখে শিক্ষার্থীরা। যার জন্য ঢাকা থেকে কোনো গাড়ি বের হতে পারছে না। ফলে অনেক গাড়ি আটকা পড়ে সাইনবোর্ড থেকেই ঘুরে যাচ্ছে। পণ্যবাহী গাড়ির পাশাপাশি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসও রয়েছে। অনেকে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য কোনো পরিবহন না পেয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। রায়েরবাগ এলাকায় কথা হয় সুমাইয়া হক নামের এমন এক যাত্রীর সঙ্গে। তিনি চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ থেকে সায়েদাবাদ যাবেন। কিন্তু গাড়ি সাইনবোর্ড এলাকা থেকেই ঘুরে যায়। সুমাইয়া হক বলেন, আজ রোববার থেকে অসহযোগ আন্দোলন তাই আজই বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে আসতে হয়েছে। এখন দেখি আজকেও সড়ক অবরোধ। তবে আমিও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে একমত। তাই হেটে হেটেই বাসায় যাচ্ছি। যাত্রাবাড়ী এলাকা ছাড়া এদিকে সড়কের কোথাও কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের সদস্য শামসুল আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের অবস্থানের ফলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী রাস্তায় অনেক গাড়ি আটকে পড়েছে। এতে মহাসড়ক একেবারে স্থবির হয়ে পড়েছে। কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। তারা সড়কের বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ করে রেখেছে।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার নিউমার্কেট মোড় এলাকায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গত শনিবার দুপুর থেকে মোড়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন তারা। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নিউমার্কেট মোড় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। একইসঙ্গে নিউমার্কেট মোড় সংলগ্ন বিভিন্ন সড়ক দিয়ে একের পর এক মিছিলযোগে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ করতে দেখা যায়। এসময় দেখা যায়, ছাত্রছাত্রীরা তাদের সহপাঠী হত্যার বিচারের দাবিতে সেøাগান দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন তাদের অভিভাবকরাও। এসময় রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার লোকজনকে আন্দোলনে আসা শিক্ষার্থীদের তালি দিয়ে সংহতি জানাতে দেখা যায়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, গতকাল শনিবার আন্দোলনে পুলিশ কোনও বাধা দেবে না। শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো কর্মসূচি পালন করতে পারবে। তবে তারা যাতে কোনও সহিংস কর্মকাণ্ড না করে সেই অনুরোধ থাকবে। পাশাপাশি নাশকতাকারীদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
আন্দোলনে আসা সাইফ উদ্দিন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে নিরপরাধ সহপাঠীদের হত্যা করেছে। গণমাধ্যমে এসেছে, তারা প্রাণঘাতী বুলেটেই মারা গেছেন। এতো প্রাণহানির পর আমাদের দাবি মেনে নিলে কী হবে? আমরা আমাদের সহপাঠীদের ফেরত চাই। গতকাল শনিবারের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে কোনও বাধা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বাকলিয়া থানা এলাকা থেকে এসে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। শনিবার পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও বাধা দেয়া হয়নি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

* বিক্ষোভে যোগ দেন অভিভাবক, শিক্ষক নানা শ্রেণিপেশার মানুষ * রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে নেন শিক্ষার্থীরা * ঢাকায় বিভিন্ন সড়কে শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়
শহীদ মিনার থেকে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা
- আপলোড সময় : ০৪-০৮-২০২৪ ১২:০৫:২৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৪-০৮-২০২৪ ১২:০৫:২৩ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ